ঢাকা ০৪:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
সংবাদ প্রকাশের পর এসআই ক্লোজ : বদলগাছীতে ৩ হাজার টাকার ফোনে ৪ হাজার ঘুষ মান্দায় সন্ত্রাসী রাজু মেম্বারের গ্রেপ্তার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ, ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম সারাদেশে খাল খননের মাধ্যমে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন করেছিলেন জিয়াউর রহমান —নিয়ামতপুরে ভূমিমন্ত্রী আদমদীঘিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ইফতার পার্টি পরিচালনাকারী আশিক গ্রেপ্তার সাপাহারের গোপালপুর ফাজিল মাদ্রাসায় নতুন ভবনের ছাদ ঢালাই কাজের উদ্বোধন বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ এবং নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিষয়ে উঠান বৈঠক নিয়ামতপুরে ৮টি ইউনিয়ন পরিষদে জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান বিষয়ক কর্মশালা  মান্দায় পুলিশের সহায়তায় বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ আত্রাইয়ে স্ত্রী-সন্তানকে জবাই করে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যা নওগাঁয় শতকোটির সড়ক উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করেছেন প্রকৌশলী নূরে আলম

নির্বাচরনকে সামনে রেখে নওগাঁ-৬ আসনে সর্বহারা-জেএমবিসহ চিহ্নিত ডেভিলদের আনাগোনো বেড়েছে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৬:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৩৩৯ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

স্টাফ রিপোর্টার : ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে নওগাঁর রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলাতে চরমভাবে উৎপাত শুরু হয় সর্বহারা (পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি) নামক বর্বর ও সন্ত্রাসী দলের। সমাজে বৈষম্য দূর করে ন্যায়ের সমতা প্রতিষ্ঠার নামে তারা শুরু করে দিন-দুপুরে মানুষ জবাই করার প্রথা। তারা বেছে বেছে ধর্নাঢ্য ও আ’লীগের প্রসিদ্ধ নেতাদের প্রকাশ্যে জবাই করা শুরু করে।

সর্বহারারা সর্বপ্রথম ১৯৯৮ সালে আত্রাই উপজেলার তৎকালীন যুবলীগ নেতা লাল মোহাম্মদ লালুকে সন্ধ্যার পর আত্রাই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন পাঁকা রাস্তার উপর শত শত জনগনের সামনে প্রথমে গুলি করে পরে বেরিকেড দিয়ে প্রকাশ্যে জবাই করার মধ্যদিয়ে এই অঞ্চলকে রক্তাক্ত করা শুরু করে। এরপর নেতা থেকে শুরু করে যারা বিত্তবান ব্যক্তি তাদেরকে টার্গেট করতো সর্বহারারা। যারা সর্বহারাদের চাহিদা পূরণ করতো তারা বেঁচে যেতো আর যারা প্রতিবাদ করতো এবং সর্বহারাদের সঙ্গে আপোষ করতো না তাদেরকে দিনের আলোয় কিংবা রাতের আঁধারে জনসম্মুখে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।

সর্বহারাদের এমন বর্বর তান্ডবের কারণে এই অঞ্চলের মানুষরা সন্ধ্যার পর আর বাহিরে বের হতেন না। ২০০৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতা ও রাণীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন মাস্টারকে দিনের আলোয় প্রকাশ্যে রাণীনগর রেলস্টেশনের প্রবেশ মুখে জবাই করে। সর্বশেষ  ২০০৩ সালের শেষের দিকে আত্রাই উপজেলার নৈদিঘী গ্রামে একই রাতে ৬জনকে জবাই করে সর্বহারারা। সেই সময় রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ প্রায় ২০জন ব্যক্তি সর্বহারাদের হাতে জবাই হয়ে হত্যার শিকার হয়েছে।

সর্বহারাদের এমন বর্বর তান্ডব ও জবাই প্রথার লাগাম টানতে ২০০৪ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শাসন আমলে মো: সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবি নামক আরেক সন্ত্রাসী ও বর্বর বাহিনীর আর্বিভাব ঘটে। তারা এসে সর্বহারার অন্যতম নেতা খেজুরকে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে হকি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে গাছে উল্টো করে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে। পরবর্তি সময়ে জেএমবিরাও সর্বহারাদের মতো শুরু করে হত্যা আর লুটপাটের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। সর্বহারা ও জেএমবির নারকীয় হত্যার ঘটনার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে রক্তাক্ত জনপথ হিসেবে পরিচিতি পায় নওগাঁ-৬ আসনের রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলা। অশান্ত হয়ে ওঠে পুরো রাণীনগর, আত্রাই ও তার আশেপাশের অঞ্চলগুলো।

পুলিশ পাহাড়ায় প্রকাশ্যে টুপি আর পাঞ্জাবী পরিহিত জেএমবির সদস্যদের হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্র, লাঠি ও হকি স্টিক নিয়ে মোহড়া ছিলো চোখে পড়ার মতো। এরপর ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে বর্বর নির্যাতন, অত্যাচার ও লুটপাট ছিলো অবর্ণনীয়। জেএমবির সদস্যদের দাপটে পরাধীন হয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে হয় এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষদের। বেশ কয়েক বছর চলতে থাকে জেএমবির বর্বর নির্যাতন আর অত্যাচার। এরপর ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর শক্ত হাতে দমন করে জেএমবি নামক সন্ত্রাসী দলকে। আইনের আওতায় এনে বাংলা ভাইকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। এরপর নিজেদের রক্ষা করতে সর্বহারা ও জেএমবির অনেক সক্রিয় সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায় আবার অনেকেই আওয়ামী লীগের তোকমা শরীরে জড়িয়ে আস্তে আস্তে প্রকাশ্যে চলে আসে।

তেমনি জেএমবির একজন সক্রিয় সদস্য হলো উপজেলার বড়গাছা ইউনিয়নের গহেলাপুর গ্রামের বড়িয়াপাড়ার নাজিম উদ্দিনের ছেলে বেলাল হোসাইন। সে ২০০৪ সালে রাণীনগর আল আমিন দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময়ে জেএমবিতে যোগদান করে জেএমবির নারকীয় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে জেএমবির একজন দাপটে নেতা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তোলে। জেএমবির নাম ভাঙ্গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবৈধ ভাবে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করে। পরবর্তিতে খেজুর হত্যা মামলা দায়ের হলে দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ বেলালকে খেজুর হত্যার অন্যতম আসামী হিসেবে চার্জশিট প্রদান করে। এরপর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে চলে যায় বেলাল হোসেন।

২০০৯ সালে আ’লীগ সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বেলাল হোসাইন অর্থের বিনিময়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাদের ম্যানেজ করে এমপি প্রয়াত ইসরাফিল আলমের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে প্রবেশ করে প্রকাশ্যে চলে আসে। পরবর্তি সময়ে এমপি ইসরাফিল অর্থের বিনিময়ে বেলালকে কাশিমপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামের ভুয়া নাগরিক (জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৬৪২২৮৫০০০২০৬) বানিয়ে তৎকালীন কাশিমপুর ইউনিয়নের কাজীকে সরিয়ে বেলালকে বিবাহ নিবন্ধনের লাইসেন্স প্রদান করে। এরপর থেকে শুরু হয় বেলাল হোসাইনের প্রতারণার তান্ডব। অল্পদিনের মধ্যেই অর্থের বিনিময়ে কাজী বেলাল হোসেন বাল্য বিয়ে ও অবৈধ বিয়ে রেজিস্ট্রি করার জনক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। অর্থের বিনিময়ে বেলাল শুধু রাণীনগরেই নয় পুরো দেশজুড়ে বিবাহ সংক্রান্ত অবৈধ কাজ শুরু করে। শুরু হয় কাজী বেলালের বিয়ে রেজিস্ট্রি করা নিয়ে অবৈধ ব্যবসা ও প্রতারণা। শুধু বিয়েই নয় অনলাইন জুয়া, চেক জালিয়াতিসহ যাবতীয় অবৈধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে কাজী বেলাল আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান এবং নিজেকে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে।

পরবর্তিতে বেলাল হোসেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেয়। নানা প্রতারণার ঘটনায় শতাধিক মামলার আসামী হয়ে যায় এই কাজী বেলাল হোসেন। কাজী বেলালের প্রতারণায় পড়ে শত শত সংসার ভেঙ্গেছে। নি:স্ব হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। প্রতারিত মানুষরা বেলালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে সবকিছু ম্যানেজ করে নিজেকে বাঁচিয়ে নেয়। নেতা ও পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এভাবেই পুরো আওয়ামী লীগের সময় বছরের পর বছর দাপটের সঙ্গে চলে কাজী বেলালের দৌরাত্ম। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন জেগে ওঠা নেতাদের লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে গিরগিটির মতো রং পাল্টে নেয় কাজী বেলাল। দেশজুড়ে যখন ডেভিল হ্যান্ট অভিযান শুরু হয় তখন বড় বড় নেতাদের ম্যানেজ করার কারণে এবং ওই সব ম্যানেজ হওয়া নেতাদের সুপারিশে পুলিশ প্রশাসনও ম্যানেজ হওয়ায় কাজী বেলাল হোসাইন আত্মগোপনে চলে যায়। গোপনে এলাকায় এসে ভাই, ছেলে ও ভাগ্নের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া অবৈধ বিয়ের কাগজে স্বাক্ষর করে যেতো।

পরবর্তিতে নতুন করে ভুক্তভোগীরা কাজী বেলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে শুরু করলে পুনরায় সংবাদের শিরোনামে চলে আসে কাজী বেলাল হোসাইন। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক রদবল হলে নিজেকে বিএনপি দলের লোক ঘোষণা দিয়ে আবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে কাজী বেলাল হোসাইন। বিগত প্রতিটি নির্বাচনে আ’লীগের নেতৃবৃন্দরা কাজী বেলালসহ সর্বহারা ও জেএমবির অনেক নেতাদের ট্রাম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। ভোটের কেন্দ্র দখল করা থেকে শুরু করে নির্বাচনকালীন সকল অপকর্ম তৎকালীন নেতারা এই সব কতিপয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে সম্পন্ন করতো। যার কারণে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে যেতে হয়নি সাধারণ ভোটারদের।

বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাজী বেলালসহ সর্বহারা ও জেএমবির লুকায়িত সদস্যদের আগমনে নওগাঁ-৬ আসনে সাধারণ ভোটারদের মাঝে নতুন করে নিবর আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। যারা অর্থের বিনিময়ে কাজী বেলালের মতো ডেভিল, চিহ্নিত প্রতারক ও বাটপারদের আশ্রয় দেয় তাদের কাছে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষরা কতটা নিরাপদ সেই প্রশ্নই নিরবে ভোটারদের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। অপরদিকে চিহ্নিত প্রতারক ও ডেভিলরা প্রকাশ্যে থাকলেও পুলিশ প্রশাসন কেন তাদেরকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করছে না সেই প্রশ্নও এই অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষদের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে।

রাণীনগর উপজেলার পশ্চিম বালুভরা গ্রামের বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা মহিদুল ইসলাম জানান, তিনি নিজেও কাজী বেলালের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সময় প্রভাবশালী কাজী বেলাল থেকে শুরু করে তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতাদের অত্যাচারের শেষ ছিলো না। শতবার প্রতিবাদ করেও কোন লাভ পাওয়া যায়নি। অথচ সেই প্রতারক বহুরূপি কাজী বেলালসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের দিনের আলোয় ঘোরাফেরা করছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সর্বহারা, জেএমবি ও ডেভিলদের অবাধ বিচরণ সাধারণ ভোটারদের মাঝে ব্যাপক ভীতির সৃষ্টি করেছে। ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হলে দ্রুতই কাজী বেলালের মতো কতিপয় প্রতারক ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ জানান, যে কোন সন্ত্রাসী ও র্দুবৃত্তদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যদি কেউ কোন প্রকারের অঘটন ঘটাতে চায় তাহলে তাকে শুধু পুলিশই নয় মাঠে থাকা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর ভাবে দমন করবে। আর যারা ডেভিল রয়েছেন উপর মহলের নির্দেশনা মোতাবেক তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

নির্বাচরনকে সামনে রেখে নওগাঁ-৬ আসনে সর্বহারা-জেএমবিসহ চিহ্নিত ডেভিলদের আনাগোনো বেড়েছে

আপডেট সময় : ০৮:০৬:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার : ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে নওগাঁর রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলাতে চরমভাবে উৎপাত শুরু হয় সর্বহারা (পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি) নামক বর্বর ও সন্ত্রাসী দলের। সমাজে বৈষম্য দূর করে ন্যায়ের সমতা প্রতিষ্ঠার নামে তারা শুরু করে দিন-দুপুরে মানুষ জবাই করার প্রথা। তারা বেছে বেছে ধর্নাঢ্য ও আ’লীগের প্রসিদ্ধ নেতাদের প্রকাশ্যে জবাই করা শুরু করে।

সর্বহারারা সর্বপ্রথম ১৯৯৮ সালে আত্রাই উপজেলার তৎকালীন যুবলীগ নেতা লাল মোহাম্মদ লালুকে সন্ধ্যার পর আত্রাই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন পাঁকা রাস্তার উপর শত শত জনগনের সামনে প্রথমে গুলি করে পরে বেরিকেড দিয়ে প্রকাশ্যে জবাই করার মধ্যদিয়ে এই অঞ্চলকে রক্তাক্ত করা শুরু করে। এরপর নেতা থেকে শুরু করে যারা বিত্তবান ব্যক্তি তাদেরকে টার্গেট করতো সর্বহারারা। যারা সর্বহারাদের চাহিদা পূরণ করতো তারা বেঁচে যেতো আর যারা প্রতিবাদ করতো এবং সর্বহারাদের সঙ্গে আপোষ করতো না তাদেরকে দিনের আলোয় কিংবা রাতের আঁধারে জনসম্মুখে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।

সর্বহারাদের এমন বর্বর তান্ডবের কারণে এই অঞ্চলের মানুষরা সন্ধ্যার পর আর বাহিরে বের হতেন না। ২০০৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতা ও রাণীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন মাস্টারকে দিনের আলোয় প্রকাশ্যে রাণীনগর রেলস্টেশনের প্রবেশ মুখে জবাই করে। সর্বশেষ  ২০০৩ সালের শেষের দিকে আত্রাই উপজেলার নৈদিঘী গ্রামে একই রাতে ৬জনকে জবাই করে সর্বহারারা। সেই সময় রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ প্রায় ২০জন ব্যক্তি সর্বহারাদের হাতে জবাই হয়ে হত্যার শিকার হয়েছে।

সর্বহারাদের এমন বর্বর তান্ডব ও জবাই প্রথার লাগাম টানতে ২০০৪ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শাসন আমলে মো: সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবি নামক আরেক সন্ত্রাসী ও বর্বর বাহিনীর আর্বিভাব ঘটে। তারা এসে সর্বহারার অন্যতম নেতা খেজুরকে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে হকি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে গাছে উল্টো করে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে। পরবর্তি সময়ে জেএমবিরাও সর্বহারাদের মতো শুরু করে হত্যা আর লুটপাটের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। সর্বহারা ও জেএমবির নারকীয় হত্যার ঘটনার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে রক্তাক্ত জনপথ হিসেবে পরিচিতি পায় নওগাঁ-৬ আসনের রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলা। অশান্ত হয়ে ওঠে পুরো রাণীনগর, আত্রাই ও তার আশেপাশের অঞ্চলগুলো।

পুলিশ পাহাড়ায় প্রকাশ্যে টুপি আর পাঞ্জাবী পরিহিত জেএমবির সদস্যদের হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্র, লাঠি ও হকি স্টিক নিয়ে মোহড়া ছিলো চোখে পড়ার মতো। এরপর ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে বর্বর নির্যাতন, অত্যাচার ও লুটপাট ছিলো অবর্ণনীয়। জেএমবির সদস্যদের দাপটে পরাধীন হয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে হয় এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষদের। বেশ কয়েক বছর চলতে থাকে জেএমবির বর্বর নির্যাতন আর অত্যাচার। এরপর ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর শক্ত হাতে দমন করে জেএমবি নামক সন্ত্রাসী দলকে। আইনের আওতায় এনে বাংলা ভাইকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। এরপর নিজেদের রক্ষা করতে সর্বহারা ও জেএমবির অনেক সক্রিয় সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায় আবার অনেকেই আওয়ামী লীগের তোকমা শরীরে জড়িয়ে আস্তে আস্তে প্রকাশ্যে চলে আসে।

তেমনি জেএমবির একজন সক্রিয় সদস্য হলো উপজেলার বড়গাছা ইউনিয়নের গহেলাপুর গ্রামের বড়িয়াপাড়ার নাজিম উদ্দিনের ছেলে বেলাল হোসাইন। সে ২০০৪ সালে রাণীনগর আল আমিন দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময়ে জেএমবিতে যোগদান করে জেএমবির নারকীয় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে জেএমবির একজন দাপটে নেতা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তোলে। জেএমবির নাম ভাঙ্গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবৈধ ভাবে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করে। পরবর্তিতে খেজুর হত্যা মামলা দায়ের হলে দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ বেলালকে খেজুর হত্যার অন্যতম আসামী হিসেবে চার্জশিট প্রদান করে। এরপর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে চলে যায় বেলাল হোসেন।

২০০৯ সালে আ’লীগ সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বেলাল হোসাইন অর্থের বিনিময়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাদের ম্যানেজ করে এমপি প্রয়াত ইসরাফিল আলমের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে প্রবেশ করে প্রকাশ্যে চলে আসে। পরবর্তি সময়ে এমপি ইসরাফিল অর্থের বিনিময়ে বেলালকে কাশিমপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামের ভুয়া নাগরিক (জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৬৪২২৮৫০০০২০৬) বানিয়ে তৎকালীন কাশিমপুর ইউনিয়নের কাজীকে সরিয়ে বেলালকে বিবাহ নিবন্ধনের লাইসেন্স প্রদান করে। এরপর থেকে শুরু হয় বেলাল হোসাইনের প্রতারণার তান্ডব। অল্পদিনের মধ্যেই অর্থের বিনিময়ে কাজী বেলাল হোসেন বাল্য বিয়ে ও অবৈধ বিয়ে রেজিস্ট্রি করার জনক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। অর্থের বিনিময়ে বেলাল শুধু রাণীনগরেই নয় পুরো দেশজুড়ে বিবাহ সংক্রান্ত অবৈধ কাজ শুরু করে। শুরু হয় কাজী বেলালের বিয়ে রেজিস্ট্রি করা নিয়ে অবৈধ ব্যবসা ও প্রতারণা। শুধু বিয়েই নয় অনলাইন জুয়া, চেক জালিয়াতিসহ যাবতীয় অবৈধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে কাজী বেলাল আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান এবং নিজেকে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে।

পরবর্তিতে বেলাল হোসেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেয়। নানা প্রতারণার ঘটনায় শতাধিক মামলার আসামী হয়ে যায় এই কাজী বেলাল হোসেন। কাজী বেলালের প্রতারণায় পড়ে শত শত সংসার ভেঙ্গেছে। নি:স্ব হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। প্রতারিত মানুষরা বেলালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে সবকিছু ম্যানেজ করে নিজেকে বাঁচিয়ে নেয়। নেতা ও পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এভাবেই পুরো আওয়ামী লীগের সময় বছরের পর বছর দাপটের সঙ্গে চলে কাজী বেলালের দৌরাত্ম। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন জেগে ওঠা নেতাদের লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে গিরগিটির মতো রং পাল্টে নেয় কাজী বেলাল। দেশজুড়ে যখন ডেভিল হ্যান্ট অভিযান শুরু হয় তখন বড় বড় নেতাদের ম্যানেজ করার কারণে এবং ওই সব ম্যানেজ হওয়া নেতাদের সুপারিশে পুলিশ প্রশাসনও ম্যানেজ হওয়ায় কাজী বেলাল হোসাইন আত্মগোপনে চলে যায়। গোপনে এলাকায় এসে ভাই, ছেলে ও ভাগ্নের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া অবৈধ বিয়ের কাগজে স্বাক্ষর করে যেতো।

পরবর্তিতে নতুন করে ভুক্তভোগীরা কাজী বেলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে শুরু করলে পুনরায় সংবাদের শিরোনামে চলে আসে কাজী বেলাল হোসাইন। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক রদবল হলে নিজেকে বিএনপি দলের লোক ঘোষণা দিয়ে আবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে কাজী বেলাল হোসাইন। বিগত প্রতিটি নির্বাচনে আ’লীগের নেতৃবৃন্দরা কাজী বেলালসহ সর্বহারা ও জেএমবির অনেক নেতাদের ট্রাম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। ভোটের কেন্দ্র দখল করা থেকে শুরু করে নির্বাচনকালীন সকল অপকর্ম তৎকালীন নেতারা এই সব কতিপয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে সম্পন্ন করতো। যার কারণে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে যেতে হয়নি সাধারণ ভোটারদের।

বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাজী বেলালসহ সর্বহারা ও জেএমবির লুকায়িত সদস্যদের আগমনে নওগাঁ-৬ আসনে সাধারণ ভোটারদের মাঝে নতুন করে নিবর আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। যারা অর্থের বিনিময়ে কাজী বেলালের মতো ডেভিল, চিহ্নিত প্রতারক ও বাটপারদের আশ্রয় দেয় তাদের কাছে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষরা কতটা নিরাপদ সেই প্রশ্নই নিরবে ভোটারদের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। অপরদিকে চিহ্নিত প্রতারক ও ডেভিলরা প্রকাশ্যে থাকলেও পুলিশ প্রশাসন কেন তাদেরকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করছে না সেই প্রশ্নও এই অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষদের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে।

রাণীনগর উপজেলার পশ্চিম বালুভরা গ্রামের বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা মহিদুল ইসলাম জানান, তিনি নিজেও কাজী বেলালের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সময় প্রভাবশালী কাজী বেলাল থেকে শুরু করে তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতাদের অত্যাচারের শেষ ছিলো না। শতবার প্রতিবাদ করেও কোন লাভ পাওয়া যায়নি। অথচ সেই প্রতারক বহুরূপি কাজী বেলালসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের দিনের আলোয় ঘোরাফেরা করছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সর্বহারা, জেএমবি ও ডেভিলদের অবাধ বিচরণ সাধারণ ভোটারদের মাঝে ব্যাপক ভীতির সৃষ্টি করেছে। ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হলে দ্রুতই কাজী বেলালের মতো কতিপয় প্রতারক ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ জানান, যে কোন সন্ত্রাসী ও র্দুবৃত্তদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যদি কেউ কোন প্রকারের অঘটন ঘটাতে চায় তাহলে তাকে শুধু পুলিশই নয় মাঠে থাকা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর ভাবে দমন করবে। আর যারা ডেভিল রয়েছেন উপর মহলের নির্দেশনা মোতাবেক তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।